অরুনোদয়ের বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
অরুনোদয়ের বীরকন্যা
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
উপমহাদেশের প্রথম নারী শহীদ প্রীতিলতার জন্ম চট্টগ্রামে ০৫ মে ১৯১১; যে সময় মহাভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এবং স্বাধীনতা এবং জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের বীজ দানা বাঁধতে শুরু করেছে।
মায়ের আদরের রাণী আমাদের প্রিয় বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার পেশায় শিক্ষক ছিলেন; পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম, ঢাকা ইডেন কলেজ ও কলকাতার বেথুন কলেজ। দর্শনে স্নাতক তিনি।
ইন্ট্রোভার্ট, লাজুক মুখচোরা প্রীতিলতা জাতীয়তাবাদের দীক্ষা নেন বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের থেকে।
১৯২৩ সালে টাইগার পাস মোড়ে মাস্টারদার লোকেরা প্রকাশ্য দিবালকে সরকারি কর্মচারীদের বেতনের ১৭,০০০ টাকা ছিনতাই করলে মাস্টারদা ও বিপ্লবী আম্বিকা চক্রবর্তীকে জেলে যেতে হয়।
কিশোরী প্রীতিলতার মনে এই ছিনতাই ও গ্রেফতার অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। তার স্কুল শিক্ষক ঊষা'দির সাথে আলোচনার মাধ্যমে মামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারেন তিনি।
১৯২৪ সাল, প্রীতিলতা দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী; বেঙ্গল অর্ডিনান্স নামের এক জরুরি আইনের আওতায় বিপ্লবীদের বিনা বিচারে আটক করা শুরু হয়। প্রীতিলতার পারিবারিক আত্মীয় পূর্ণেন্দু দস্তিদার তখন বিপ্লবী দলের সদস্য। পূর্ণেন্দু দাদা ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত কিছু বই প্রীতিলতার কাছে গোপনে রাখার ব্যবস্থা করেন। লুকিয়ে লুকিয়ে প্রীতিলতা পড়েন “দেশের কথা”, “বাঘা যতীন”, “ক্ষুদিরাম” আর “কানাইলাল”; এই বইগুলোই প্রীতিলতাকে বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রানিত করে।
প্রীতিলতা দাদা পূর্ণেন্দু দস্তিদারের কাছে বিপ্লবী সংগঠনে যোগদান করার গভীর ইচ্ছার কথা বলেন। কিন্তু তখনো পর্যন্ত বিপ্লবীদলে মহিলা সদস্য গ্রহণ করা হয়নি বলে প্রীতিলতার তখন সদস্য হওয়া হয়নি।
প্রীতিলতা যখন ঢাকা ইডেন কলেজে আই.এ পড়া শুরু করলেন, তখন ঢাকায় "শ্রীসংঘ" নামের এক বিপ্লবী সংগঠনের “দীপালী সঙ্ঘ” নামে একটি মহিলা শাখা ছিল। যারা মূলত গোপনে মেয়েদের বিপ্লবী সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করতো, আর প্রকাশ্যে নারী শিক্ষা প্রসারের কাজ করতো। দীপালী সঙ্ঘে যোগ দিয়ে প্রীতিলতা লাঠিখেলা, ছোরাখেলা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন। এবং এভাবেই নিজেকে মহান মাস্টারদার একজন উপযুক্ত কমরেড হিসাবে নিজেকে গডে তোলার চেষ্টা চালিয়েছেন।
১৯২৯ সালের মে মাসে চট্টগ্রামে সূর্য সেন ও তার সহযোগীরা চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের জেলা সম্মেলন, ছাত্র সম্মেলন, যুব সম্মেলন ইত্যাদি আয়োজনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। নারী সম্মেলন করবার কোন পরিকল্পনা না থাকলেও বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের বিপুল উৎসাহের জন্যই সূর্য সেন নারী সম্মেলন আয়োজনের সম্মতি দেন। মহিলা কংগ্রেস নেত্রী লতিকা বোসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে প্রীতিলতা ঢাকা থেকে এবং তার বন্ধু ও সহযোদ্ধা কল্পনা দত্ত কলকাতা থেকে এসে যোগদান করেন। তাদের দুজনের আপ্রাণ চেষ্টা ছিল সূর্য সেনের অধীনে চট্টগ্রামের বিপ্লবী দলে যুক্ত হওয়ার কিন্তু ব্যর্থ হয়ে তাদের ফিরে যেতে হয়।
১৯৩০ সালের ১৯ এপ্রিল আই এ পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ফিরে আসেন প্রীতিলতা। আগের দিন রাতেই চট্টগ্রামে বিপ্লবীদের দীর্ঘ পরিকল্পিত আক্রমণে ধ্বংস হয় অস্ত্রাগার, পুলিশ লাইন, টেলিফোন অফিস এবং রেললাইন। এটি “চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ” নামে পরিচয় লাভ করে। চট্টগ্রামের মাটিতে বিপ্লবীদলের এই উত্থান সমগ্র বাংলার ছাত্রসমাজকে উদ্দীপ্ত করে। প্রীতিলতা এ সম্পর্কে লিখেছিলেন “পরীক্ষার পর ঐ বছরেরই ১৯শে এপ্রিল সকালে বাড়ি ফিরে আমি আগের রাতে চট্টগ্রামের বীর যোদ্ধাদের মহান কার্যকলাপের সংবাদ পাই। ঐ সব বীরদের জন্য আমার হৃদয় গভীর শ্রদ্ধায় আপ্লুত হল। কিন্তু ঐ বীরত্বপুর্ণ সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে না পেরে এবং নাম শোনার পর থেকেই যে মাষ্টারদাকে গভীর শ্রদ্ধা করেছি তাঁকে একটু দেখতে না পেয়ে আমি বেদনাহত হলাম”।*
মাস্টারদার সহচর রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সাথে প্রীতিলতা আলীপুর জেলে বিভিন্ন সময় প্রায় ৪০ বারের মতো কাজিন (ছদ্মবেশে) পরিচয়ে সাক্ষাৎ করেন এবং দীপালী সংঘের সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যান। রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসির পর বিপ্লবী কর্মকান্ডে প্রীতিলতার আগ্রহ অনেকগুণ বেড়ে যায়।
কলকাতা থেকে বি.এ শেষ করে প্রীতিলতা এবার চট্টগ্রামে ফিরে আসেন ১৯৩০/৩১ সালে। একটা স্কুলে প্রধানশিক্ষকের কাজ যোগাড় করেন।
সহযোদ্ধা কল্পনাকে মাস্টারদার সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছে পোষণ করলে পরবর্তীতে ১৯৩১ সালে বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক ঘটনার ঘনঘটায় প্রীতিলতার সাথে বিপ্লবী নির্মল সেনের পরিচয় হয় এবং নির্মল বাবু মাস্টারদাকে প্রীতিলতার আগ্রহ সম্পর্কে জানান।
১৯৩২ সাল, চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের প্রায় ২ বছর, মূল সংগঠনের অনেক বিপ্লবীই তখন জেলে। এদিকে লুকিয়ে বিপ্লবী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন মাস্টারদা ও নির্মল সেন। এমন সময় মাস্টারদার সাথে একদিন সাক্ষাৎ হয় প্রীতিলতার। (মে/জুন মাসের কোন এক দিন, গোপন আস্তানায়**)
এদিকে পুলিশ মাস্টারদাকে ধরিয়ে দেবার পুরষ্কার হিসেবে ১০,০০০ টাকা ঘোষনা করেছে। বিভিন্ন অপারেশনে প্রীতিলতার কিছু নথিপত্র পুলিশের হাতে গেলে মাস্টারদা প্রীতিলতাকে আত্মগোপনে যাবার নির্দেশ দেন।
১৯৩২ এর ১০ আগস্ট ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের দিন ধার্য করা হয়, শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর নেতৃত্বে সাতজনের একটা দল সেদিন ক্লাব আক্রমণ করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর প্রতিজ্ঞা ছিল ক্লাব আক্রমণের কাজ শেষ হবার পর নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরার যদি সুযোগ থাকে তবুও তিনি আত্মবিসর্জন দেবেন। তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন।
এই আত্মাহুতি দেবার আইডিয়াটা প্রীতিলতার পছন্দ হয়।
মাষ্টারদা ১৯৩২ এর সেপ্টেম্বর মাসে ক্লাবে হামলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই আক্রমণের দায়িত্ব তিনি নারী বিপ্লবীদের উপর দেবেন বলেন মনস্থির করেছিলেন। কিন্তু সাতদিন আগেই পুলিশের হাতে পুরুষবেশী কল্পনা দত্ত ধরা পরে গেলে আক্রমণে নেতৃত্বের ভার পড়ে একমাত্র নারী বিপ্লবী প্রীতিলতার উপর।
২৩ সেপ্টেম্বর শনিবার মাঝরাতে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সহযোদ্ধাদের নিয়ে পাহাড়তলীর ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ শেষে পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৪ সেপ্টেম্বর ভোররাতে প্রীতিলতা পটাসিয়াম সায়ানাইড মুখে পুরে আত্মাহুতি দেন মহান বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।
আজ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার -এর ৯০ তম আত্মাহুতি দিবস। বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম নারী শহীদ এই মহান মানুষকে।
* শংকর ঘোষ সম্পাদিত "প্রীতিলতাঃ প্রমিথিউসের পথে" বই থেকে নেয়া উদ্ধৃতি।
** মাস্টার দা সূর্য সেন উদ্ধৃত; শংকর ঘোষ সম্পাদিত প্রমিথিউসের পথে বই থেকে।
প্রবন্ধটির বেশির ভাগ তথ্য জেনেছি বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের অনুপম প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত একটি বই থেকে। মূলত স্মৃতি থেকেই লেখা, সময় স্বল্পতার কারণে রেফারেন্স ক্রসচেক না করেই পোস্ট করছি।
নিলয় শাহ্রিয়ার
শাহ্রিয়ার কামাল নিলয়
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হতে ব্যবসায় প্রশাসন (বিপনন ও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা-কৌশল, পরিকল্পনা) বিষয়ে স্নাতক এবং জহির রায়হান ফিল্ম ইন্সটিটিউট হতে ফিল্ম ও মিডিয়া প্রডাকশন বিষয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেছেন। বিপনন যোগাযোগ কৌশল, পরিবেশ, মানব সম্পদ, উন্নয়ন অধ্যয়ন ও প্রকাশনা বিষয়ক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রুজিরোজগারে নিবিষ্ট।
কাজের অবসরে চেষ্টা করেন নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে। যোগাযোগ করতে পারেন নিম্নোক্ত মাধ্যমে:


Informative blog, keep forward.
উত্তরমুছুনঅসংখ্য ধন্যবাদ জনাব।
মুছুন